গাইবান্ধা জেলা হাসপাতালঃ খাদ্য নিয়েও চরম দুর্নীতি! দেয়া হচ্ছে মেয়াদ উত্তির্ন বাসি রুটি, পঁচা কলা, দুই টাকার বিস্কুট!

মাসুম লুমেনমাসুম লুমেন
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৭:৩৩ PM, ২৭ জুন ২০২০

খাদ্য নিয়েও চলছে অমানবিক  দুর্নীতি! গাইবান্ধা জেলা হাসপাতাল সরকারের এক বিষফোঁড়ার নাম! এখানে রোগীদের দেয়া হচ্ছে পঁচা কলা, মেয়াদ উত্তির্ন ছয় টাকা দামের ছোট রুটি আর বিকেলের নাস্তা হিসেবে দেয়া হচ্ছে দুই টাকা দামের ছোট একটি  বিস্কুটের প্যাকেট!

গাইবান্ধা জেলা হাসপাতালে  রোগীদের জন্য বরাদ্দ খাবার বিতরণে অনিয়মের অভিযোগের বহু পুরনো। টেন্ডার বানিজ্য থেকে শুরু করে রোগীর খাবার নিয়েও এখানে সব অনিয়ম যেন নিয়মে পরিনত হয়েছে। এখানে সরকারি বরাদ্দে যে পরিমাণে, যে দামের খাবার সরবরাহ করার তালিকা রয়েছে তা কখনো পুরণ করা হয় না। রোগীদের সরবরাকৃত খাদ্যের মান এবং খাদ্য তালিকা অনুযায়ী দেখা যায়, সরকার নির্ধারিত বরাদ্দে প্রতিটি রোগীর জন্য সকালে ও দুপুরে যে পরিমাণে মানসম্মত  খাবার সরবরাহ করার কথা রয়েছে, রোগীরা সে পরিমাণ খাবার পাচ্ছেন না।

সরেজমিনে গত রবিবার (২১ জুন) বিকেল তিন’টায় গিয়ে দেখা যায় ঠিকাদারের এক কর্মচারী দুপুরের খাবার সরবরাহ করছেন। দেখা গেছে, তার খাবার বহন করা ট্রলিতে মোটা সিদ্ধ ভাত, ছোট ছোট মাছের টুকরো, ( দেখতে মুসা মাছের), একটি গামলায় পাতলা ডাল, মিস্টি কুমড়া আর আলুর দিয়ে তৈরি সামান্য পরিমাণ সবজি। সেই ট্রলিতেই বিকেলের নাস্তা হিসেবে  ট্রলির উপরে সাজানো পঁচা ও নরম কলা এবং দুই টাকা দামের ছোট বিস্কিটের প্যাকেট।

এরপর আবার সোমবার (দুপুর দেড়টায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ভর্তিকৃত রোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের জন্য প্রতিদিন যে পরিমাণ এবং যে মানের খাবার দেওয়ার কথা, বাস্তবে  ঠিকাদার কখনোই তা সরবরাহ করছেননা। নির্দিষ্ট মাছ এবং গোসত যে পরিমাণ (গ্রাম হিসেবে) দেয়া হয় তা বরাদ্দের তুলনায় খুবই সামান্য।

এভাবেই গাইবান্ধা জেলা হাসপাতালে আসা অসহায় ও হত-দরিদ্র রোগীরা একদিকে সঠিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত, অন্যদিকে সরকারের দেয়া একটু পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবারের জন্য রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে। ছোট সাইজের পঁচা কলা, পাঁচ টাকা মূল্যের বিস্কুটের পরিবর্তে দুই টাকা মূল্যের ছোট প্যাকেটের বিস্কুট আর এগারো টাকা মূল্যের ভাল মানের রুটির পরিবর্তে দেয়া হচ্ছে ছয় টাকা দামের নিন্মমানের মেয়াদ উত্তির্ন বাসি রুটি। দুপুরে দেয়া হচ্ছে মোটা চালের গন্ধযুক্ত ভাত, সাথে বিভিন্ন সবজি দেয়ার কথা থাকলেও রোগীদের শুধু মিস্টি কুমড়া ও আলুর তরল ঘাটি আর সামান্য পরিমাণে পাতলা মুসুরির ডাল। নিয়ম অনুযায়ী চিকন চালের বদলে রোগীদের খাওয়ানো হয় মোটা ও নিন্মমানের চাল।

রোগীদের সাথে এমন প্রতারণা করার নেপথ্যে রয়েছে মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধহীন ঠিকাদারের অনিয়ম ও দুর্নীতি। সেই সাথে আবাসিক মেডিকেল অফিসারের (আরএমও) পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন থেকে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র একই কাজ বারবার করার ফলে হাসপাতালের সর্বাংশে অনিয়ম-দুর্নীতি খুটি গেড়ে বসেছে। এছাড়া মূল ঠিকাদার কাজ না করে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দায়িত্ব  দিয়ে দায়সারা কাজ করছেন। আর সেই সুযোগে স্থানীয় এই চক্রটি হাস্পাতালের কেনাকাটা ও খাদ্য সরবরাহে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করছেন।
মেয়াদোত্তীর্ণ পাউরুটি নিয়ে অভিযোগ করছেন এক রোগী

হাসপাতালে কথা হয় পুরুষ ওয়ার্ডের বি-৩৬ নাম্বার বেডের রোগী গাইবান্ধা সদরের মধ্য ধানঘরা থেকে আসা মজনু মিয়ার সাথে। তিনি জানান, ট্রাকের চাকায় তার এক পা ভেঙে গেছে। ১৫ দিন থেকে ভর্তি আছেন। সকালে বাসি রুটি, পঁচা কলা আর সিদ্ধ ডিম পেলেও রাতে মিস্টি কুমড়া-আলুর সামান্য ঘাটি আর পাতলা ডাল ছাড়া কোনদিন মাছ-মাংস কিছুই পাইনি। দুইদিন আগে মোবাইলটাও চুরি হয়েছে।

বি-১৭ বেডের রোগী সদর উপজেলার লক্ষিপুরের বাসিন্দা গোলাম আজম বলেন, সকালে একটা রুটি, নরম কলা এবং ডিম দিয়েছে। রুটির মেয়াদ পার হয়েছে জন্য খেতে পারিনি। শুধু ডিম আর কলা খেয়ে আছি। সেই কলাও ছোট আর পঁচার মতো।

বি- ২২ বেডের রোগীর স্বজন জানান, সকালের নাস্তা ঠিকভাবে করতে পারেনাই। ছাঁতাপরা রুটি দিয়েছিল। আর বিকেলে দুই টাকা দামের ছোট একটা বিস্কুটের প্যাকেট দেয়। আর ভাত তো খাওয়ার মতো নয়। মোটা আর গন্ধ করে।
কলা এবং পাউরুটি নিয়ে অভিযোগ করছেন রোগীর স্বজন

বি-২৩ বেডের সত্তোর্ধ্ব বয়সের রোগী জামাল মিয়া সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের দক্ষিণ গিদারী গ্রাম থেকে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। তিনি কথা বলতে না পারায় তার পাশে থাকা স্বজন এ প্রতিবেদককে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সকালে যে রুটি দিয়েছে সেটা পঁচা পঁচা ভাব, আর ফাঁসকা ধরা। কলাটাও একেবারে ছোট (হাতের তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে)। ডিমটাতেও গন্ধ ছিল।

হাসপাতালের কুক রুবেল জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন যে মানের খাবার বরাদ্দ দেন সেই খাবারই সরবরাহ করা হয়। সপ্তাহে তিনদিন গোশত ( বয়লার দুইদিন ও খাসির মাংস একদিন) দেয়ার কথা থাকলেও অনেক সময় তা দিতে পারিনা। রুই, কাতলা ও মৃগেল এই তিন প্রকারের বড় সাইজের মাছ দেয়ার কথা থাকলেও আমাদেরকে যে সাইজের মাছ দেয়া হয় আমরা তাই রোগীদের দিচ্ছি। এছাড়া হরেকরকম সবজি সরবরাহ না করে শুধু মিস্টি কুমড়া, আলু, ও মাঝে মাঝে চাল কুমড়া দেন। রোগীদের জন্য সরকার থেকে মানসম্মত খাবার বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে সেই মানের ও পরিমাণের খাবার দিতে পারছিনা।

এ ব্যাপারে জেলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার হারুন-অর রশিদ বলেন, এর আগেও এ ধরনের অভিযোগ পেয়েছিলাম। তখন ঠিকাদারকে ডেকে মৌখিকভাবে সতর্ক করেছি। এর কিছুদিন পর আবার রোগীর  খাদ্য নিয়ে অভিযোগ ওঠে। দ্বিতীয় বার ঠিকাদারকে লিখিতভাবে সতর্ক করেছি। কিন্তু তার পরেও আবার যেহেতু অভিযোগ পেলাম, সেহেতু বিষয়টি গুরুত্ত্বের সাথে দেখা হবে।

জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মাহফুজার রহমানের নিকট এ বিষয়েটি নজরে আনা হলে তিনি সংবাদ পরিবেশন না করে ঠিকাদারের সাথে কথা বলতে বলেন। তিনি আরও বলেন, আমি আর কয়েকদিন আছি। যাওয়ার সময় এ ধরনের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি খারাপ হবে।

এ প্রসঙ্গে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক আব্দুল মতিন বলেন, রোগীদের খাদ্য নিয়ে দুর্নীতি অনিয়ম সহ্য করা হবেনা। এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

গাইবান্ধা জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক, সর্বোচ্চ করদাতা ও বিশিষ্ট ঠিকাদার শাহ আহসান হাবিব রাজিব বলেন, ভর্তিকৃত রোগীদের জন্য যে পরিমাণ খাবার সরবরাহ করার কথা, তা না করে ঠিকাদারের ইচ্ছেমত ও অনিয়মন্ত্রাণিক ভাবে খাবার দেয়া হচ্ছে- এটা ঠিক নয়। সরকার এই করোনা দুর্যোগে মানুষের খাদ্য ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এমন দুর্যোগকালীন সময়ে  রোগীদের চিকিৎসা এবং খাবার নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি কোন ভাবেই কান্য নয়। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্নীতি অব্যাহত থাকলে অবশ্যই সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অভিযোগ খতিয়ে দেখে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

এভাবেই নিন্মমানের খাবার খেয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা দরিদ্র ও অসহায় রোগীরা আরো বেশি রোগী হয়ে বাড়ি ফিরছেন। রুই মাছের বদলে খেতে হচ্ছে রুইয়ের বাচ্চা। সকালের নাশতায় খাচ্ছেন পঁচা, বাসি ছোট নিন্মমানের  পাউরুটি ও অখ্যাত কোম্পানির ছোট বিস্কিট। অভিযোগ রয়েছে হাসপাতালে সরবরাহকৃত পাউরুটি ও বিস্কিট কোম্পানী গুলোও বিএসটিআই অনুমতিবিহীন!

উল্লেখ্য সম্প্রতি বর্তমান ঠিকাদারদের টেন্ডার ও ক্রয় সংক্রান্ত অনিয়ম দুর্নীতির চিত্র তুলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পূর্ব থেকে কাজ করে আসা এক ঠিকাদার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক রংপুর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহা পরিচালক, ঢাকা এবং  দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরাবর অভিযোগ দাখিল করেছেন। আশ্চর্যের বিষয়, এত কিছুর পরেও জেলা হাসপাতালের পরিচালকের নিরবতা নিয়েও গাইবান্ধার সচেতন মহলের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :